বন্যায় কুরবানি

    রাস্তার ধারে একটি গাছের তলে বসে আছে কুড়িগ্রামের মানিক মিয়া। তার চোখ নিবদ্ধ ফুঁসে ওঠা আগ্রাসী ব্রহ্মপুত্রের প্রশস্ত বুকে।

    ব্রহ্মপুত্রের সুশীতল বাতাস ও স্রোতের কলকল ধ্বনি এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করলেও এর কোনো প্রভাব পড়ছে না মানিক মিয়ার অন্তরে। কারণ, এর বুকে যে হারিয়ে গেছে তার ঘর-বাড়ি, অনেক যত্নে গড়া সবজির জমি।

    কয়েকমাস আগে ঋণ নিয়ে ঘরগুলো ঠিক করেছিলো, পাশেই ছোট করে গরুর খামার বানিয়েছিলো কিন্তু এতসব যে নদিভাঙ্গনের ফলে হারিয়ে যাবে তা সে কল্পনাও করেনি।

    ছোট বড় দুটি গরু ছিলো। ভেবেছিলো এই ঈদে বিক্রি করে ঋণ শোধ করবে কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাকে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে। এই টাকা দিয়ে ঋণও শোধ হবে না, নতুন ঘরের কাজও হবে না। ত্রাণ না আসুক অন্তত সঠিক দামে গরু দুটি বিক্রি হলে তার অনেক উপকার হতো।

    গত ঈদে তার ছেলে সিয়াম ও মেয়ে আয়েশাকে বলেছিলো কুরবানী ঈদে নতুন জামা কিনে দিবে, এ ঈদে পারবে না। স্ত্রীকেও এমন আশ্বাস দিয়েছিলো। এবার ঈদে এসব কিনে দেয়া তো দূরের কথা ঘর তুলবে কি করে, ঋণ চুকাবে কী করে সে চিন্তায় অস্থির তার মন। দুঃখে কষ্টে ইচ্ছে হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের বিশাল বুকে নিজেকেও সঁপে দিতে।

    আজ ৭দিন ধরে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কবে পানি নেমে যাবে, কবে আবার কাজ করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এদিকে হাতে কিছু টাকা ছিলো তাও এ কয়দিন বাজার করে শেষ।

এখন কীভাবে কী করবে বুঝতে পারছে না। সালাতুল হাজত পড়ে দোয়া করেছে আল্লাহ যেন একটি ব্যবস্থা করে দেন।

    এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে বসে ছিলো মানিক মিয়া। হঠাৎ এক গরুর হাম্বা ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকালো। দেখলো, পাঞ্জাবী-টুপি পরা এক যুবক মাঝারি ধরণের একটি গরু হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই যুবকটি সালাম দিলো। গরুর রসিটি তার হাতে দিয়ে বললো এই গরুটি আল্লাহর এক বান্দা কুরবানীর জন্য কিনেছেন। আপনাকে দিয়েছেন, আপনি কুরবানীর দিন এটা তার পক্ষ থেকে জবাই করে এর গোশতো নিজে খাবেন ও অন্যকে দিবেন। হাতে থাকা একটি খাম তার হাতে দিতে দিতে যুবকটি বললো এতে ১০ হাজার টাকা আছে তা দিয়ে আপনার নগদ প্রয়োজন মিটাবেন।

    মানিক মিয়া আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কে আপনি আর আমাকেই বা দিচ্ছেন কেন?

    জবাবে যুবকের সরল উত্তর। আমি মাদরাসার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী। এক বিত্তবান মুখলিছ বান্দা বন্যার্তদের উদ্দেশ্যে এসব পাঠিয়েছেন। আমাদের হাতে থাকা এমন কয়েকটি প্যাকেজের মধ্যে আপনাকে একটি দিলাম।

    জবাব শুনে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললো মানিক মিয়া। কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর প্রতি মাথা নুয়ে এলো, আবেগাপ্লুত হৃদয়ের আনন্দ দুচোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু হয়ে। ঈদ উদযাপনের এক সুখের পরিবেশে স্ত্রী ও সন্তানের হাসিমাখা মুখগুলো ভেসে উঠলো কল্পনার জগতে।

    চোখ বন্ধ করে আসমান মুখী হয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, 'আল্লাহ তুমি ওই বান্দার এ মহৎ কাজকে কবুল করো, যিনি কোন প্রকার লৌকিকতা ছাড়া কুরবানী দিচ্ছেন ও সাহায্য করছেন'।

No comments

Powered by Blogger.