কোটা সংস্কার

এক.
রাতুল দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা শেষে একটা বাস পেলো। যাত্রী ভরা বাস তবুও উঠে পড়লো। টিউশন শেষে ফিরছিলো সে। রাত ৯টা বাজে। এখন মেসে যাবে। গিয়ে খাবে কিছু। দুপুরে তো খায়নি, বিকেলে হালকা নাশতাও করেনি।

রাতুলের বয়স ২৯। সাড়ে পাঁচফুট লম্বা। মেদহীন স্লিম বডি। সৌন্দর্যে অতুলনীয়, দেখতে অসম্ভব সুন্দর। পোশাকেও স্মার্ট। মুখে রয়েছে কিছু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। কত মেয়ে যে তাকে প্রপোজ করেছে তা হিসেবের বাইরে। কিন্তু কারো ডাকে সাড়া দেয়নি। কারণ সে ক্লাস টেন থেকে ভালোবাসে একজনকে। এখনো তারা একে অপরের জান-প্রাণ। একজন আরেকজনে না দেখে ঘুমায় না কোন দিন। তাদের মাঝে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে, ব্রেকআপ হয়েছে কিন্তু তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসার ব্রেকআপ হয়নি কখনো।

রাতুল একটা ছিট খালি পেয়ে বসে যায়। টিস্যু পেপার বের করে ঘাম মুছতে থাকে। ভাবতে থাকে, আর কত কষ্ট করতে হবে তাকে।

ঢাকা কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে পড়েছে সে। ইচ্ছে ছিলো বিসিএস ক্যাডার হবে। প্রিলি পার করে রিটেনেও টিকে যায় কিন্তু বিপত্তি ঘটে মেধা তালিকায়। পর্যাপ্ত আসন অনুযায়ী মেধা তালিকায় টিকলেও কোটার জন্য বরাদ্ধকৃত আসনের জন্যে ছিটকে পড়ে সে।

বাড়ির বড় ছেলে সে। তিনদিন যাবৎ তার বাবা হসপিটালে, আজ মাসের ৮ তারিখ হলেও অগ্রিম টিউশন ফি নিয়ে টাকা পাঠিয়েছে বাড়িতে। এতদিন যাবৎ বাড়ি থেকে টাকা নিয়েছে কিন্তু এখন বাড়ির লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কখন টাকা পাঠাবে সে। তারা জানে ছেলের লেখাপড়া শেষ এখন হয়তো চাকরি করে। মা বারবার আবদার করে দ্রুত বিয়ে করে ঘরে বউ আনতে। হবু বউও তাড়া করছে বিয়ের কথা বলে। কিন্তু সমস্যা শ্বশুর মশাইকে নিয়ে। উনি খুঁজছেন চাকরিজীবী ছেলে। রাতুলকে তো দু'চোখেও দেখতে পারে না। ভাবছিলো বিসিএসে টিকলে হয়তো সব সমস্যার সমাধান ঘটবে কিন্তু তা আর হলো কই!

হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো, কল রিসিভ করলো। ওপার থেকে কান্নারত এক কণ্ঠ শুনতে পায়। বললো, "রাসেল এখন হসপিটালে, মাথা ও কাঁধে ২১টা সেলাই দিতে হয়েছে। এখন আমরা তাকে আমার বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনি দ্রুত আসুন।"

রাসেল তার ভাই, কল দিয়েছিলো রাসেলের বন্ধু।

দুই.
রাসেল নিজেকে নরম বিছানার উপর আবিষ্কার করলো। চোখ খুললো সে। প্রথমেই চোখ পড়লো সিয়ামের উপর, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় তাকিয়ে ছিলো সে। এরপর তাকালো দরজার দিকে। তার ভাই রাতুল দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে।

রাসেলের মনের পড়ে সে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছিলো। এরপর পুলিশের অমানবিক হামলা শুরু হয়। সে পাশের জুনিয়রকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই মাথায় আঘাত পায়, এরপর টিয়ারগ্যাস ও গুলি থেকে বাঁচার জন্য দৌড় দিতে গিয়ে পড়ে যায় রোডে, পিছন থেকে এক সিনিওর ভাই এসে আঘাত করে কাঁধে। আগে ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে যেত কিন্তু আজ কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেয়ার কারণে ভাই অনেক হুমকি দিয়েছিলো সেই হুমকির কার্যকারিতা পেলো ঘাড়ে, হাতে, পায়ে। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। আর নিজেকে আবিষ্কার করে সিয়ামের বিছানায়।

রাসেল শুয়ে আছে সিয়ামের বাসায়; তাদের ফ্যামিলি বাসা।
 সিয়াম রাসেলের ভালো বন্ধু। তারা দু'জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ সেশনের ছাত্র।

অপরদিকে সিয়ামের বড় ভাই রিয়াদ রাতুলের বাল্যবন্ধু। এক সাথে ক্লাস টেন পাশ করেছে। রাতুল যখন ক্লাস টেনে একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলো, রিয়াদও পছন্দ করেছিলো এক মেয়েকে। কিন্তু সে এক আজিব ছেলে। নিজের পছন্দের কথা বাড়িতে জানায়। তার আব্বুও অনেক অ্যাডভান্সড। কথা বলে মেয়ের পরিবারের সাথে। মেয়ের পরিবার ও রিয়াদের বাবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তখনই বিয়ের কথা ঠিক হয়। মেয়ে তখনো ক্লাস সিক্সে পড়ে; মেয়েও রাজী। সমস্যা হলো বয়স নিয়ে। জামিয়ার মুফতি সাহেবের সাথে আলোচনা করে বিয়ের কাজটা সেড়ে ফেলে। তবে শর্ত হলো তারা এখন যতই প্রেম করুক এক সাথে থাকতে পারবে না এলাকাবাসী জানবে না যে তারা বিবাহিত। রাতুল এ খবর শুনে তখন হেসেছিলো। মজা করতো তাকে নিয়ে।

রাতুল ও রিয়াদ দু'জনেই প্রেম করতো। রাতভর মোবাইলে কথা বলতো। ঘুরতে যেত নিজেদের গার্ল্পফ্রেন্ড নিয়ে। প্রতিযোগিতা ছিলো দুই কপলের মাঝে। পরে অবশ্য রিয়াদ দু'বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেছে। সুন্দর ফুটফুটে এক সন্তান এসেছে কোলে।

রিয়াদও বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছিলো কিন্তু কোটা বৈষম্যের কারণে ছিটকে পড়ে সে। এখন স্বামী-স্ত্রী দু'জনে প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালায়।

No comments

Powered by Blogger.