লিফটের সেই মেয়েটি

এক.

বাসে বসে অবসর সময় কাটাতে ফেসবুক ব্রাউজ করছিলো রফিক। কিছুদিন যাবৎ সে একটা বিষয় খেয়াল করছে, তার প্রতিটা পোস্টে 'চাঁদের আলো' নামে একটা আইডি সবার আগে লাভ রিয়াক্ট দেয় ও কমেন্ট করে। প্রতিটা কমেন্টে থাকে ভূয়সী প্রশংসা ও শুভ কামনা। দু'দিন আগে মেসেজে লিখেছে, 'I want to like you', মনে মনে হাসে কিন্তু রিপ্লাই দেয়নি সে। আইডিতে ঢুকে দেখে ব্যক্তিগত কোন তথ্য নেই; আছে সুন্দর সুন্দর লেখা ও কবিতা। ছেলে না মেয়ের আইডি তাও বোঝার উপায় নেই।

হঠাৎ রফিক খেয়াল করলো এক ভদ্রলোক তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে অভিজাত বংশের। মনে হচ্ছে লোকাল বাসে উঠতে অভ্যস্থ না। সে সাথে সাথে ছিট ছেড়ে দিয়ে ভদ্রলোককে বসতে অনুরোধ জানায়। ভদ্রলোক না করলে সে বললো, 'আমি এতক্ষণ বসাই ছিলাম একটু পর আমি নেমে যাবো, আপনি বসুন আপনার ভালো লাগবে।' লোকটি ধন্যবাদ জানিয়ে বসে পড়লো।

এমন সময় পিছনে চেঁচামেচি শুনতে পেয়ে রফিক ফিরে তাকালো। দেখলো অনেকেই রুমাল, মাস্ক ইত্যাদি দিয়ে নাক ঢাকছে, কেউ জানালা দিয়ে থুথু ফেলছে। এক বয়স্ক মহিলাকে উদ্দেশ্য করে কয়েকজন গালাগালি করছে। কারণ, মহিলা বাসের গলিতে প্রচুর বমি করেছে। এমনিতেই প্রচণ্ড গরম তার উপর রাস্তায় জ্যাম। প্রচুর লোক বাসে ওঠায় ভেতরের পরিবেশও হয়ে গেছে মুরগীর ফার্ম। এর মধ্যে যদি কেউ বমি করে তাহলে কার না খারাপ লাগবে। মহিলার বা কি দোষ; এই ফাঁপা গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে হয়তো বমি করে ফেলেছে।

রফিক দ্রুত মহিলার সামনে গেলো। ব্যাগ থেকে পানির পট বের করে দিয়ে বললো, 'আপনি কুলি করুন'। আর কিছু টিস্যুও দিলো। পাশেই এক কলেজ ছাত্র হেডফোন কানে লাগিয়ে ও মুখে মাস্ক পড়ে বসে ছিলো। তাকে দাঁড় করিয়ে বললো, 'এই, আন্টিকে বসতে দাও, তুমি দাঁড়িয়ে যাও। আর এই নাও ৩০ টাকা। স্পীডের একটা ক্যান কিনে নিজের এনার্জি বাড়িয়ে নিও'। এরপর দ্রুত নীচে নেমে গেলো, বাস থামিয়ে প্যাকেটে করে কিছু ধুলামাটি নিয়ে এলো। ঢেকে দিলো বমিভরা জায়গাটুকু।

রফিকের কাণ্ড দেখলো সবাই। বিশেষ করে ভদ্রলোক শুধু তাকিয়েই আছে রফিকের দিকে। ভাবছে, এ দেখি আশ্চর্য এক ছেলে! অল্প সময়ে কত কি না করলো! সবাই যখন ঘৃণায় গালাগালি করছিলো তখন সে ঘৃণা তো করলোই না উলটো মহিলার শারিরিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করলো। আবার সবার সুবিধার্থে ঢেকে দিলো বমির জায়গাটুকু। কৌতূহলী মনে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলো তোমার নাম কি বাবা? সে মিষ্টি হেসে জবাব দিলো, 'রফিক'।

২৬ বছর বয়সী রফিক, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। অপরদিকে কওমি মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাশ করেছে। এখন নারায়ণগঞ্জের এক মসজিদের ইমাম ও খতিব। ব্লগে লেখালেখির পাশাপাশি ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ের উপর ইসলামিক লেকচার আপলোড করে । দেখতে সুন্দর, চারিত্রিক সৌন্দর্যেও অসাধারণ। সে যে কোন মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে।

গাড়ি শাহবাগে আসলে, নেমে গেলো সে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফিরছিলো। যাবে ক্যাম্পাসে, এরপর ফিরবে মসজিদে।

দুই.

"বিনয় এমন একটি বাহন যা সম্মানের উচ্চ শিখরে পৌঁছায়", মিষ্টি স্বরে মেয়েলী কণ্ঠে নিজের প্রিয় উক্তি শুনে পিছন ফিরে তাকায় রফিক। চোখাচোখি হয়ে যায় এক মেয়ের সাথে। মেয়েটা তার এক বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলছিলো। পুরো শরীর হাত-পা মোজা ও বোরকায় আবৃত হলেও চোখ দু'টো দেখা যাচ্ছে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে দু'জন। দু'চোখ দু'চোখের গভীরে ঢুকেছিলো, পড়ে নিয়েছিলো একে অপরের মনের ভাষা। তাকানোর স্থায়ীত্ব তিন চার সেকেন্ডের বেশী না হলেও কেমন জানি মনে হয়েছে তারা অনেক্ষণ তাকিয়ে ছিলো।

ঘটনাটি ঘটেছিলো ৩ মাস আগে। বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের লিফটে। কেন যেন মেয়েটিকে ভালো লেগে যায় তার। এই প্রথম কোন মেয়ে তার হৃদয়ে ভালোলাগা জন্মিয়েছে। কোন লিফটে উঠলে, ঘুমাতে গেলে কল্পনার রাজ্যে ভেসে আসে শুধু ওই চোখ দু'টি। ভাবে, যে মেয়ে বিনয়ের কথা বলতে পারে, না জানি সে কত বিনয়ী। বিনয় সচ্চরিত্রের মৌলিক উপাদান। বিনয় মানুষকে খাঁটি মানুষ বানায়। বিনয়ের সে উক্তি ভালোলাগার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় অনেক।

আজ বিছানায় শুয়ে ওই মেয়েটির কথাই ভাবছিলো। অনেকবার মন থেকে ঝেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। ভাবে, ওই অপরিচিতাকে নিয়ে ভেবে কি হবে? আবার ভাবে কোন মেয়েকে তো আমার ভালো লাগেনি, একে ভালো লাগলো কেন? দেখি না একটু খুঁজে কে সেই মেয়েটি, কেন সে ভালোলাগার?

ইতোমধ্যে খুঁজেছেও অনেক। লিফটে মেয়েটির এক বান্ধবী বলেছিলো, 'কাল আমাদের মিনহাজ স্যারের এসাইনমেন্ট আর আজ আমরা কি না শপিং করছি'। আরেকটা মেয়ে বলেছিলো, 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস আমার একদমই ভালো লাগে না'।

তাই সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার পাবলিক প্রাইভেট সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে খোঁজ লাগিয়েছে কোথাও এমন মেয়ের হদিস পাওয়া যায়নি। দু'একজন বন্ধু তামাশা করে বলেছিলো, 'যে রফিক আমাদের প্রেম করতে না করে সে নিজেই এখন প্রেমে পড়েছে'। জবাবে একটা হাসি মেরে রসিক ঢঙে বলেছে, 'আমি পাত্রী খুঁজছি, বিয়ের বয়স হয়েছে না, তোরা আমায় হেল্প কর'। অবশ্য বন্ধুরাও অনেকভাবে খুঁজেছে, কিন্তু পাইনি।

ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়ে আছে সে। ভাবছে এখন এসব নিয়ে। হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্যারদের নামের লিস্ট দেখার বুদ্ধি। মোবাইল নিয়ে তালাশে নামে। একসময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্যারদের নামের লিস্টে মিনহাজ উদ্দিন নামে এক স্যারের নাম দেখতে পায়, যিনি যমুনা টিভির সংবাদ পাঠ করেন। সিলেবাস ঘেটে দেখে বাংলা নিয়ে একটা কোর্সও আছে এখানে। হারানো মুক্ত খুঁজে পাওয়ার মত খুশিতে ভরে যায় রফিকের অনুসন্ধানী মন। সাথে সাথে কল দেয় জবির ইসলামিক স্টাডিজে পড়ুয়া এক বন্ধুর নাম্বারে, বলে, 'কাল তোর ক্যাম্পাসে আসছি। সময় দিস একটু'।

পরদিন সকালে উপস্থিত হয় জবির ক্যাম্পাসে। সাংবাদিকতা বিভাগে যায় তার বন্ধু রাসেলসহ। দুঃখের বিষয়, খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে এ বিভাগে এমন কোন মেয়ে নেই। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগেও একটু ঘুরেফিরে দেখে, কিন্তু কোথাও এমন মেয়ে চোখে পড়েনি।

এ এক বিব্রতিকর অনুসন্ধানী কাজ। মনে মনে ভাবছে, যাক গে, আর খুঁজবো না। আল্লাহ ভালো কোন জোড়া মিলিয়ে দিবেন ইনশাআল্লাহ।

নামাজের জন্য তারা উভয়ে জবির মসজিদের দিকে হাঁটা শুরু করে। হঠাৎ রফিকের চোখ আটকে যায় মসজিদের পাশে মহিলাদের জন্য নামাজ ঘরের দিকে। তিনটি মেয়ে নামাজ ঘর থেকে বের হচ্ছে। এরা তারা যারা সেদিন লিফটে ছিলো। রাসেলকে দ্রুত সেদিকে ইশারা দিয়ে বলে, 'এই সেই লিফটের মেয়েটি'। রাসেল বিস্ময়ের সুরে বলে, 'এ বোরকা পড়া মেয়েটি তো আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর। নাম নাঈমা আক্তার আর সাথে মেয়ে দু'টো সাংবাদিকতা বিভাগের'। স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে দু'জনে। নামাজ পড়ে বের হয় ইসলামিক স্টাডিজের অফিস রুমের দিকে।

তিন.

অফিস স্টাফ নাইমার ব্যাপারে কোন তথ্য দিতে রাজি নয়। তবে রাসেল ডিপার্টমেন্ট এর ফার্স্ট বয়, তাই অনেক জোড় করায় শুধু অভিভাবকের নাম্বার দিতে রাজি হয়। নাম্বার নিয়ে রাসেল রফিকের মোবাইলে নাইমার পিতার নাম্বার সেভ করলো। নাম জানা নাই তাই লিখলো Father-in-Law।

রাসেল নাঈমা সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলে বললো, 'আমি মনে করি তুই তোর মনমত কাউকে খুঁজে পেয়েছিস। যে শুধু নিজে নামাজ পড়ে না, অন্যকে মসজিদে নিয়ে যায়। মেয়েদেরকে পর্দার ব্যাপারে বুঝায়। মোট কথা জ্ঞানে-গুণে অনন্য এক মেয়ে যার তুলনা এই যুগে মেলা বড় দায়।'

অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রাসেলকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নেয় রফিক। এ সময় মোবাইলে কল আসে। মসজিদের মুয়াজ্জিনের কল। রিসিভ করতেই ওপার থেকে সালামের আওয়াজ পেলো। রফিকের জবাব শেষ হতেই ওপারের কণ্ঠ বলে উঠলো, 'আপনার এক বিশেষ মেহমান এসেছেন, দ্রুত আসুন। সাথে মিষ্টি জাতীয় কিছু আনবেন'। রফিক 'আচ্ছা ঠিক আছে' বলে কল কেটে দিলো।

রফিকের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। আপন বলতে তার কেউ নেই, তাই গ্রামে যাওয়া হয় না। সাভারে মামা আছেন, তিনিই তার সব। ছোটকাল থেকে বড় হয়েছে সেখানেই। তার বিশেষ মেহমান কে হতে পারে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। তার মামা কল দেয়া ছাড়া তার মসজিদে আসবেও না। মুয়াজ্জিন যেভাবে বললো তাতে মনে হচ্ছে বিশেষ কেউ বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছেন। আর সে মেহমানদারি করে শুধু মিষ্টিমুখ করাটা বাকি রেখেছে। কৌতূহলী মন নিয়ে দ্রুত হাঁটা শুরু করলো রফিক।

আধাঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যায় রফিক। দেখে মসজিদের সামনে একটা প্রাইভেট কার দাঁড় করানো। মুয়াজ্জিন মসজিদের গেটেই দাঁড়িয়ে ছিলো, রফিককে দেখে হাসিমুখে সালাম জানিয়ে বললো, 'মেহমানকে আপনার রুমে বসিয়েছি। উনি সাভারের এক লেবেল কোম্পানির একাউন্ট ম্যানেজার। জনাব মামুনুর রশিদ। আপনার খুব প্রশংসা করছে। আপনার সম্পর্কে ব্যাপক জানেন উনি। ভালো করে লাঞ্চ করিয়েছি, মিষ্টিটা দিন আমি প্লেটে করে নিয়ে আসছি।

রফিক চিনতে পারেনি তবুও কামরার দিকে এগুলো। কামরায় ঢুকেই সালাম দিলো। দেখলো সোফায় বসা সেই ভদ্রলোক যার সাথে সেদিন বাসে দেখা হয়েছিলো। রফিকের চোখে-মুখে বিস্ময়, কৌতূহল, জিজ্ঞাসা সব এসে ভীর জমিয়েছে। ভাবনায় পড়ে যায় সে।

ভদ্রলোক সালামের জবাব দিয়েই কোন ভূমিকা ছাড়াই বললো 'আমি পাত্র দেখতে এসেছি'। ভদ্রলোকের মুখে আনন্দ ও দুষ্টুমি মিশ্রিত মুচকি হাসি। কেমন জানি উনি আগে থেকেই জানেন যে রফিক তার মেয়ে জামাই হবে। রফিক আবারো বিস্ময়ে থ বনে গেলো। দ্বিতীয় বিস্ময় কাটিয়ে মুখে মুচকি হাসি টেনে স্বাভাবিকভাবে বলতে চেষ্টা করলো, 'আগেই তো দেখেছেন একবার, আবার এলেন যে?'

ভদ্রলোক শুরু করলো ভিন্ন কথা, "জানো আমি তোমাকে খুঁজতে কত দৌড়াদৌড়ি করেছি? তুমি সেদিন শাহবাগে নেমেছিলে, তাই আশেপাশের সব মাদরাসা মসজিদে খোঁজ লাগিয়েছিলাম। দু'দিন অফিসেও যাইনি। আমার স্ত্রী এসব জানতে পেরে বলে, 'এত খোঁজ করার চেয়ে আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করেছি তুমি বরং তাকেই খুঁজে বের করো।' আমি বললাম, 'পছন্দ করেছো আবার খুঁজতে হবে কেন? সে বলে তুমি খুঁজবে কি না বলো। যত দিনই লাগুক আমি তো তুমি রফিককেই খুঁজে বের করবো তবুও তার পছন্দের ছেলেটা দেখতে চাইলাম তাই সে আমাকে কম্পিউটার রুমে নিয়ে গেলো। বললো, 'আমি আমার পছন্দের ছেলেটার বিরাট ফ্যান। তার ইউটিউব চ্যানেলের প্রতিটা ভিডিও প্রথম আমিই প্লে করি ও লাইক দেই। ছেলেটা যে কত ভালো তা বলে শেষ করা যাবে না'। আমি বললাম, 'কথা না বাড়িয়ে দ্রুত দেখাও'। সে ইউটিউব চ্যানেলে ঢুকলো। একটা ভিডিও প্লে করলো। দেখলাম ভিডিওর বক্তা সে আর কেউ নয়, সেই কিংবদন্তী তুমি, যাকে আমি বাসে দেখেই ভেবে রেখেছিলাম, এমন একটা ছেলে আমার চাই।

ভিডিওর নীচে দেয়া লিংক থেকে তোমার ফেসবুক আইডিতে ঢুকি। ঢাবিতে ইসলামিক স্টাডিজ পড়ো দেখে সাথে সাথেই ছুটে যাই ডিপার্টমেন্ট এ। এক জুনিয়রকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করলে বললো, 'রফিক ভাই আজ আসেননি তাদের ক্লাস আজ নেই'। এরপর তোমার এই মসজিদের কথা বললে সোজা চলে আসি এখানে।"

রফিক কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। থতমত করে কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু ভদ্রলোক রফিককে কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই একটা কার্ড হাতে দিয়ে বললো, ' আমার সময় কম, এখন উঠতে হবে। তুমি এক সময় তোমার মামাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসো, এটা আমার হৃদয়ের আকুল আবেদন আশা করি আসবে'।

রফিক পরে কল দিয়ে জানাবে বললো।

ভদ্রলোক মসজিদ থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেলো। গাড়ি যতদূর দেখা যায় রফিক সেদিকে শুধু তাকিয়েই রইলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো, আমি খুঁজি কাকে আর আমায় খোঁজে কে? হঠাৎ মেসেজের আওয়াজ পেয়ে মোবাইলের স্ক্রীন অন করলো। স্ক্রীনে ভেসে উঠলো একটি লেখা, 'I like you'। মেসেজ এসেছে সেই 'চাঁদের আলো' আইডি থেকে। রফিক কি লিখে রিপ্লাই দিবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। সে এমন এক স্টিকার খুঁজতে লাগলো যা দিয়ে বোঝাবে I gonna be mad।

চার.

আয়ের উৎস না থাকলে কেউ বিয়ে দেয় না আবার বিয়ে না করলে ইমামতিও পাওয়া যায় না। একটা ছেলে যত ভালোই হোক, তার যদি কোন আয়ের উৎস না থাকে কোন মেয়ের বাপ ভুলেও তাকায় না। কিন্তু যখন একটা আয়ের উৎস চলে আসে, সব মেয়ের বাপ-মার চোখ পড়ে সেই ছেলের উপর। ঘন ঘন কল দেয়, খোঁজ নেয়। মমতা মাখা সুরে জিজ্ঞেস করে, 'বাবা কেমন আছো'। তাদের কথায় ও চোখে মুখে ভাবখানা এমন হয় যে, কেমন জানি তারা মনে মনে বলে 'বাবা, আমার তো একখান মেয়ে আছে, বিয়া করে ফেলো না'। রফিকের অবস্থা হয়েছে ঠিক এমনই।

রফিক যখন মসজিদের ইমামতি নেয় তখন শর্ত ছিলো বিবাহিত হতে হবে। রফিক বলেছিলো, 'ইনশাআল্লাহ কিছুদিনের মধ্যেই সেরে ফেলবো'। কিন্তু সেই কিছুদিনের পরিমাণ এখন ৬ মাস হয়ে গেছে। এই মসজিদের ইমাম সাহেবের জন্য ফ্যামিলি বাসার ব্যবস্থা করে রাখা আছে। আজ ফজরের পর মসজিদের সভাপতি রস করে বলছিলো, 'হুজুর, আপনার বাসাটা তো একা থাকতে থাকতে তিক্ত হয়ে যাচ্ছে'। রফিক তখন মুচকি হেসে বলেছিলো, 'দোয়া করেন বাসার একাকিত্ব দ্রুত শেষ হতে যাচ্ছে'।

রফিক সকালের নাশতা সেড়ে এখন পড়ার টেবিলে বসে আছে। রাসেলকে কল দিয়ে জানতে পারে নাইমার বাসা সাভারে। রাসেল ভালোভাবে খোঁজ লাগিয়ে বিস্তারিত ঠিকানা বের করে রফিকের কথামত কাল তার মামাকে এসব তথ্য দেয়। তার মামা সাভারে থাকায় চিনতে পারে নাইমার বাবাকে। রফিক তার মামাকে নাইমার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলে তাই তার মামা খোঁজও লাগিয়েছে গোপনে। কিছুক্ষণ আগে তার মামা কল দিয়ে জানালো, নাইমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তাই তার মামা বললো, সরাসরি খোঁজ নিয়ে আর লাভ কি? এই পাত্রীর আশা ছেড়ে দাও'।

রফিক এমন খবর শুনতে প্রস্তুত ছিলো না। সে ভাবেওনি এমন কিছু শুনবে। হৃদয়ের এক কোণে সৃষ্টি হয় ক্ষত, মোচড় দিয়ে উঠে ভালোবাসার জায়গাটুকু। কিন্তু কি আর করার, নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। যা ভাগ্যে নেই তা নিয়ে বেশী ভাবতে নেই মনে করে ভিন্ন কিছু ভাবতে চায় কিন্তু ভাবনার অপর পিঠে ভেসে উঠে লিফটের সেই মায়াবী চোখ দুখানা। এবার সেই চোখদুটি তাকিয়ে নেই বরং অবনমিত, কেমন জানি চোখদুটি রফিকের চোখকে বলছে 'ওভাবে তাকিও না আমার দিকে, এ ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই'।

রফিকের সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে যায় যে ভদ্রলোক দু'দিন আগে দেখা করে গিয়েছিলেন। এখনো ফোন দিয়ে তাকে কিছু বলা হয়নি। এখন মামাকে দিয়ে ভদ্রলোকের ব্যাপারে খোঁজ নিবে ভাবছে সে। তাই ভদ্রলোককে কল দিয়ে মামার সাথে সাক্ষাতের বিষয়টা জানানোর জন্যে তার দেয়া কার্ড বের করলো। ওপেন করলো মোবাইলের ডায়াল প্যাড। উঠানো শুরু করলো নাম্বার। পুরো নাম্বার উঠানো শেষ করে দেখে নাম্বার আগে থেকেই সেভ করা আছে, Father-in-Law নামে। ধাঁধায় পড়ে যায় সে। ভাবে, এই নামে তো রাসেল সেদিন নাইমার বাবার নাম্বার সেভ করেছিলো। তার মানে কি, ভদ্রলোক আর নাইমার বাবা একই ব্যক্তি?

সে যা দেখছে ভুল দেখছে না তো। দুহাতে চোখ দুটো কচলিয়ে আবার দেখলো। নাম্বার সেভ করার ডেট চেক করলো। কার্ড থেকে নাম্বার আবার উঠালো। সব কিছু দেখে ফলাফল একটাই পেলো। নাইমার বাবা ও ভদ্রলোক একই ব্যক্তি। খুশিতে লাফিয়ে ওঠে সে। আনন্দে নেচে ওঠে তার মন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হতে থাকে 'আলহামদুলিল্লাহ'।

এমন সময় মেসেঞ্জারের টুং শব্দ শুনে মোবাইল স্ক্রীনের দিকে তাকায় সে । দেখে, মেসেজ এসেছে সেই চাঁদের আলো আইডি থেকে। ভেসে উঠেছে একটা মেসেজ, 'I love you'। রফিক রিপ্লাই দিলো সাথে সাথে, 'দুঃখিত, আমার একজন প্রিয়া আছে' সেদিক থেকে মেসেজ শুধু seen হলো রিপ্লাই আসলো না আর।

রফিক মোবাইলের ডায়াল প্যাড ওপেন করলো, সে কল দিবে এখন তিনজনকে; মামা, রাসেল ও হবু স্বশুর ভদ্রলোককে।

পাঁচ.

জন্ম, বিয়ে, মৃত্যু। জীবনের তিনটি ধাপ। এই তিনটি ধাপকে কেন্দ্র করে মানুষ অনুসরণ করে নানা সংস্কৃতি। ধর্ম ও সমাজ ভেদে বিভিন্ন সংস্কৃতি দেখা গেলেও অনেক কুসংস্কারও জায়গা পেয়েছে এসবে। বিশেষ করে বিয়েতে।

মুসলিম সমাজে সুন্নতি বিয়ে আদর্শ বিয়ে হিসেবে গণ্য করা হয়। মেয়ের পছন্দ অনুযায়ী অভিভাবক তার পাত্র ঠিক করবে, বংশীয় মান অনুপাতে মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করবে এরপর মেয়েকে পাত্রের হাতে তুলে দিবে দু'জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে। আর পাত্র রাজী থাকলে বলবে কবুল। কেউ খোতবা ও দোয়া করে শেষ করে দিবে। তারপর পাত্র নির্ধারিত মোহর দিয়ে পাত্রী নিয়ে আসবে এবং পরে একদিন পরিচিতদের ওলিমা করে খাওয়াবে। খুবই সহজ ও সাধারণ বিয়ে, কিন্তু মুসলিম সমাজ একে করেছে জটিল থেকে জটিলতর যার কারণে পতিতাবৃত্তি ও বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক হয়ে গেছে সহজ থেকে সহজতর।

রফিক ও নাইমার বিয়ে হয়েছে সুন্নতি পদ্ধতিতে। তারা এখন রফিকের মামার বাসায়। রফিকের ঘর আজ বিশেষ সাঁজে সজ্জিত। বিয়ে হওয়ার দুদিন হয়ে গেলেও আজ তাদের প্রথম রাত।

ঘোমটা দিয়ে খাটের উপর বসে আছে বঁধু সাজে সজ্জিত নাইমা। ঘরে প্রবেশ করেই সালাম দিলো রফিক। খাটের পাশে এসে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো, 'আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি?' ঘোমটার ভিতর থেকে আওয়াজ আসলো, 'বসুন'। 'জানেন আমি আপনাকে কতটা পছন্দ করি?', অপরিচিতের মত ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলো রফিক।
ঘোমটার ভিতর থেকে আওয়াজ আসলো, 'জ্বি না'।

রফিক তখন সেই লিফটের ঘটনা, এরপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে খোঁজাসহ জবিতে খুঁজে পাওয়ার কাহিনী খুলে বললো। অনেক খোঁজার পরও খুঁজে না পেয়ে শেষে নিরাশ হওয়া এবং মামার দেয়া খবর 'নাইমার পাত্র ঠিক হয়ে গেছে' শুনে হতাশ হওয়ার কথাও খুলে বললো রফিক। এরপর বললো, 'আমরা আজ থেকে জমিয়ে প্রেম করবো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, আমি কি আপনাকে প্রপোজ করতে পারি? কোন জবাব পেলো না। তবুও রফিক নাইমার হাত দু'টি ধরে বললো, 'আই লাভ ইউ'

হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে নাইমা জবাবে বললো, 'দুঃখিত, আমার একজন প্রিয় আছে'। রফিক আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো প্রিয় আছে মানে? নাইমা ধীরে সুস্থে বললো,'আমি ২মাস যাবৎ এক ছেলেকে ভালোবেসে আসছি। তাকে আমি প্রপোজও করেছি। কিন্তু কোন সারা দেয়নি। আমার বিশ্বাস তিনি সারা দিবেন। কিন্তু বাবা-মা আপনার কথা অনেক আগ্রহ ভরে বলায় আমি রাজী হয়ে যাই। তবে আপনি যেহেতু আমায় বিয়ে করেছেন আবার প্রপোজও করেছেন তাই আমি বিষয়টা ভেবে দেখবো।

রফিকের ভাবনায় পড়ে যায়। ভাবতে থাকে, যাকে আমি এত ভালোবাসি সে কি না অন্যকাউকে ভালোবাসে। সে নরম সুরে ক্ষীণ আওয়াজে জিজ্ঞেস করে, 'কাকে ভালোবাসেন জানতে পারি কি?'

নাইমা পালটা প্রশ্ন করলো, 'শুনতে চান, নাকি দেখতে চান?'
রফিক জবাব দিলো, 'দেখতে পেলে শুনতে চায় কে!'
নাইমা বললো, 'আপনার মেসেঞ্জার চালু করুন, দেখতে পাবেন সেখানে।'

রফিক মোবাইলটা পকেট থেকে হাতে নিলো, ইন্টারনেট কানেকশন চালু করার সাথে সাথেই মেসেঞ্জার টুং শব্দ করে উঠলো। মেসেজ এসেছে সেই চাঁদের আলো আইডি থেকে, ভেসে উঠেছে একটি লাভ স্টিকার। এই বাসর রাতেও ডিস্টার্ব দিচ্ছে মনে করে রাগে ব্লক মারতে চাইলো আইডিটাকে, এমন সময় লাভ স্টিকারের নীচেই ভেসে উঠলো একটি লেখা, "আমিই সেই লিফটের মেয়েটি"। চমকে ওঠে রফিক। চিন্তায় পড়ে যায়, এর মানে চাঁদের আলো আইডি আর কারো নয়, নাইমারই আইডি। এতদিন মেসেজ করে আসছিলো নাইমাই। তারমানে তার সেই ভালোবাসার ছেলে আর কেউ নয় আমি রফিক। ভেবে খুশি হয়ে যায় রফিকের মন।

রফিক দ্রুত ফিরে তাকায় নাইমার দিকে। দেখে নাইমার সেই উজ্জ্বল মুখে ঘোমটা আর নেই। চাঁদের মত সুন্দর চেহারায় খেলছে শুধু দুষ্টুমির হাসি। আর চোখ দিয়ে ঠিকরে পড়ছে মায়াবী চাহনী। রফিক হাত উঁচু করে জোড়ে এক কিল উঠায় নাইমার পিঠ লক্ষ্যে, নাইমা চোখ দু'টো বড় করে ওমা বলে চিৎকার দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে রফিকের কোলে। এভাবেই নাটকিয়তা দিয়ে শুরু হয় তাদের বাসর রাত। গল্পে ও রোমাঞ্চে কাটতে থাকে সারা রাত।

No comments

Powered by Blogger.