অরিত্রির আত্মহননের মূল কারণ কী?

ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারী ঐশির আত্মহত্যা শুধু অধ্যক্ষ জিন্নাত আরার প্রতি নীরব প্রতিবাদ নয়। এটা বাংলাদেশের সব শিক্ষক শিক্ষিকা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের প্রতি সতর্কীকরণও বটে।

অরিত্রি আত্মহত্যা করেছে তাই বলে আমরা তার নকল করার বিষয়টা চেপে যাবো তা কিন্তু ঠিক নয়। হুজুগে বাঙ্গালীর এটাই সমস্যা। যখন কেউ নিহত হয়, আত্মহত্যা করে কিংবা পঙ্গু হয় তখনই মানুষের প্রতিবাদী চেতনা জাগে। কিন্তু এমন ঘটনা যে সবসময়ই ঘটে সে জন্য কিন্তু কেউ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে না।

সবাই একটা দিক নিয়ে ভাবে সব দিক নিয়ে নয়। অরিত্রি আত্মহত্যা করেছে তাই তিনজনের এমপিও বাতিল করা হয়েছে। সারাদেশে সবাই অদক্ষ্যকে দুষছে কিন্তু অরিত্রির নকল করা যে অনেক বড় অন্যায় সেটা বলছে না কেউ।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সম্পর্ক হওয়া চাই মাতাপিতা ও সন্তানের সম্পর্কের মত। যেখানে রাগ-অভিমান থাকবে কিন্তু ক্ষোভ থাকবে না। শাসন থাকবে কিন্তু অপমান থাকবে না। হাজারো ভুল হলেও ক্ষমার দরজা বন্ধ হবে না। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকবে কিন্তু ভয় থাকবে না। স্নেহ ও মায়ামমতা থাকবে কিন্তু ক্রোধ থাকবে না।

এমন সম্পর্ক সহসা গড়ে ওঠে না। কিছু পিতামাতাই প্রকৃত পিতামাতা হয়ে উঠতে পারেন না আবার অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রকৃত শিক্ষাগুরু হতে পারেন না।

অপরদিকে সব সন্তানই নিজ মা বাবাকে সহজে বুঝতে পারে না পরিপূর্ণ বুঝে তখন যখন নিজে মা কিংবা বাবা হয়। আবার সব শিক্ষার্থীই তার শিক্ষাগুরুকে শ্রদ্ধা ভালোবাসা দিতে পারে না দিতে বুঝে তখন যখন নিজে শিক্ষাগুরু বনে যায়।

আমরা শিক্ষার্থীরা যখন পরস্পর কথা বলি তখন বলি অমুক স্যার বা ম্যাডাম অনেক ভালো। উনাকে আমার অনেক ভালো লাগে। যখন আমরা কিছু শিক্ষকের সামনে দিয়ে যাই তখন কাউকে দেখে শ্রদ্ধায় নত হয়ে যাই, সালামের পর সালাম জানাই। তবে কিছু শিক্ষক দেখে আমাদের শ্রদ্ধাবোধ জাগে না, মুখে সালাম বাজে না। কেন জানেন? না জানলে বুঝে নেন।

মাদরাসায় পড়াকালে দেখেছি, এক ছাত্রের হাতে মোবাইল পাওয়ার কারণে মাদরাসার নিয়মানুযায়ী তাকে সাথে সাথে বহিষ্কার করা হলো এবং মাদরাসা হল থেকে সবকিছু নিয়ে চলে যেতে বলা হলো। ছাত্রটি বললো আমাকে বের করে দেয়া হলে আমার জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে, এই মুহূর্তে ভাড়াও নেই যে বাড়িতে চলে যেতে পারবো। হুজুর নিজ পকেট থেকে ৫০০/- দিয়ে বললেন এবার যাও। আর কোন মাদরাসায় ভর্তি হতে সমস্যা হলে আমাকে জানিও আমি সুপারিশ করার চেষ্টা করবো কিন্তু দয়া করে আমাকে এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভঙ্গ করতে বলো না। এবার বলুন এই হুজুর কি শুধু শিক্ষক ছিলেন নাকি পিতাও? এমন শিক্ষক শিক্ষিকা আছে কিন্তু খুবই কম।

একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা সাধারণত তিন কারণে শাসন করেন।

এক.
শিক্ষা দেয়ার জন্য। কঠিন কথায় শাসায়, সতর্ক করে কিন্তু অপমান করে না। লাঠি বা বেত ব্যবহার করে কিন্তু রাগের মাথায় না। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কার্যকর করে কিন্তু দুর্ব্যবহার করে না। এটাই প্রকৃত শাসন যেটাতে মিশ্রিত থাকে স্নেহ, ভালোবাসা ও অফুরন্ত কল্যাণ কামনা।

দুই.
রাগ মেটানোর জন্য। দেখবেন কোন শিক্ষার্থী হয়তো অনেক দুষ্টুমি করছে বা কথা মানছে না তখন শিক্ষক বা শিক্ষিকা অনেক রেগে যান, মুখে যা আসে তাই বলেন, হাতে যা পান তাই ব্যবহার করেন। অনেক সময় বেঁধে পিটুনি দেন। এটা শাসন নয় বরং নিজের রাগের বহিঃপ্রকাশ।

তিন.
শত্রুতা বশতঃ। এটা সাধারণত শিক্ষা-বাণিজ্যে ঘটে থাকে। যে শিক্ষার্থী মেধা দিয়ে ভর্তি হয় তার ছোট ভুল অনেক বড় করে দেখা হয়। আর যে টাকা দিয়ে ভর্তি হয় তাকে আদর সোহাগ দিয়ে ভুলগুলো ঢেকে রাখা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের গণিত শিক্ষকের কাছে গণিত প্রাইভেট না পড়ে যদি অন্য শিক্ষকের কাছে গণিত প্রাইভেট পড়ে তাহলে সে হয় দুনিয়ার সেরা শত্রু। ভালো পরীক্ষা দিলেও পায় অর্ধেক নাম্বার। আর যে তার কাছেই প্রাইভেট পড়ে সে শুধু বন্ধু নয় যেন চিরদিনের বন্ধু। ফেল করলেও এ-প্লাস পায়। এটা মূলত শাসন নয় বরং শত্রুতা।

অনেকেই ভাবছে অরিত্রি এই তৃতীয় শাসনের স্বীকার।

অনেকেই বলছে সামান্য ভুলের কারণে তার মাবাবাকে ডেকে অপমান করা ঠিক হয়নি।

দেখুন, নকল করাকে যদি সামান্য ভুল বলেন তাহলে আপনিও ভুল করছেন। নকল অবশ্যই অনেক বড় অন্যায় এটাকে বড় বলতে হবে সামান্য বলার সুযোগ নেই। আর নিয়ম অনুযায়ী টিসি দিতে হলে মা-বাবাকে ডেকে বুঝাতে হবে যে প্রতিষ্ঠান কেন টিসি দিচ্ছে। সুতরাং মা-বাবাকে ডাকাটা ভুল মনে করা ঠিক না।

তবে আপনি ওই অধ্যক্ষ বা অন্যান্য দায়িত্বশীলদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কারণ একটা মানুষ শুধু একদিনের আচরণে কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিতে পারে না। একদিনের রাগে কেউ তালাক দেয়া না। একদিনের আচরণে কারো ব্রেকআপ হয় না। একদিনের কথায় কেউ কাউকে হত্যা করে না। প্রতিটা বড় রাগ, ক্ষোভ ও যন্ত্রণার মাঝে লুকায়িত থাকে অনেকগুলো রাগ, ক্ষোভ ও যন্ত্রণা।

একটি ঘটনা শুনুন— এক লোক গাধার পিঠে প্রচুর জ্বালানি কাঠ উঠাচ্ছিলো। এক পথিক দেখে বললো, ভাই আর উঠাবেন না, গাধার কোমর ভেঙ্গে যাবে। লোকটি ভ্রক্ষেপ না করে আরও দ্বিগুণ কাঠের টুকরা উঠালো। সবশেষ একটি ছোট ও চিকন কাঠের টুকরা গাধার পিঠে রাখার সাথেসাথেই গাধাটির কোমর ভেঙ্গে পড়ে গেলো ও মরে গেলো। লোকটি আফসোস করে বললো। হায় শুধু এই ছোট্ট একটা কাঠের জন্য আমার গাধাটি মরে গেলো।

আসলে গাধার কোমর ভেঙ্গে গেছে কি শুধু একটি ছোট কাঠের ভরে? না বরং অনেকগুলো কাঠের ভরে।

এবার ভাবুন অরিত্রিরা কি শুধু একদিনের আচরণে আত্মহত্যা করে নাকি এর পিছনে অনেক দিনের আচরণ লুকিয়ে থাকে?

অরিত্রি যে শুধু নিজের পিতার অপমান দেখে আত্মহত্যা করেছে তা নাও হতে পারে। এমনও হতে পারে যে নিজের অপরাধের ফলে স্কুল থেকে টিসি পাওয়ার পর মা-বাবার সামনে বা সমাজে মুখ দেখাতে ভয় পাচ্ছিলো তাই হয়তো আত্মহননের পথ বেঁচে নেয় সে। এক্ষেত্রে আপনি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার জন্য মা-বাবার ও সমাজের কঠোর মনোভাবকে দায়ী করতে পারেন। মেয়েটা নিজের নকল করার অপরাধের সাজা মেনে নিতে পারেনি তাই আত্মহত্যা করেছে এমনটাও বলা যায়।

মেয়েটা বাবার অপমান বুঝতে পারলো কিন্তু নিজের নকল করার অপরাধ বুঝতে পারলো না। এর জন্য দায়ী আমাদের নকল সম্পর্কে সস্তা মনোভাবের কারণে।

একজন মেধাবী ছাত্র ভালো শিক্ষক নয়। ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধু মেধাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আচরণ-উচ্চারণের মাধুর্য ও আরও কিছু দক্ষতা।

আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত দেশের মত উন্নত হতে থাকলেও মনমানসিকতা এখনো উন্নত হয়নি। নতুন শিক্ষক হয়েই অনেকে ভাব দেখান, সাক্ষাতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রাখেন কিন্তু এই শিক্ষকই যখন বিদেশী কোন প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণার কাজ করে আসেন তারা অনেক বদলে যান। ছাত্রদের প্রতি তাদের স্নেহ-ভালোবাসা উপচে পড়ে। বিনয়ে নরম হয়ে যান। সাক্ষাতের জন্য নিজের কাজ বন্ধ করেন। একান্ত না পারলে দুঃখ প্রকাশ করেন কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় চেয়ে নেন।

আমাদের উন্নত জাতি হওয়ার জন্য উন্নত মনমানিসকতার বড় প্রয়োজন।

সারকথা এই, অরিত্রির আত্মহত্যা শুধু একজন অধ্যক্ষের দুর্ব্যবহারের পরিণাম নয় এটা আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা, অযোগ্য শিক্ষাগুরু, কঠোর মনোভাবের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর দুর্বল মানসিকতার উল্টাপিঠ মাত্র।

No comments

Powered by Blogger.